ফটোগ্রাফিতে রঙ ও রঙের ব্যবহার
চোখ মেলেই আমরা যা দেখি সবই রঙের খেলা। আমাদের ঘরের দেয়াল, আমাদের পরিধেয় পোশাক, প্রতিদিনের রান্নার জন্য যে সবজি, পড়ার বই সবকিছুতেই রঙ। রঙ ছাড়া আমরা কিছুই দেখি না। এই মহাবিশ্বের দৃশ্যমান সব বস্তুর একটা রঙ আছে।
প্রথমেই জেনে নিই রঙ কি-
রঙ নিয়ে প্রথম গবেষণা করেন বিজ্ঞানী নিউটন। নিউটন গবেষণা করে দেখেন রং কোন বস্তুর নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য নয় এবং এটা আলাদা কোন বস্তুও নয়। সাধারণত কোন বস্তুর পৃষ্ঠ বা তলের উপর আলো পড়লে যদি বস্তুটি আলোর সবটুকু শোষন করার পরে কোন একটা রঙ শোষন করতে না পেরে সেটাকে প্রতিফলিত করে দেয় তাহলে আমরা বস্তুটিকে সে রঙের দেখি।
ফটোগ্রাফার হিসেবে ছবি তোলার জন্য অনেকগুলো বিষয় মাথায় রাখতে হয়, জানতে হয় এবং বিষয়গুলো মাথায় রেখেই ছবি তুলতে হয় যেমন- Composition Rules, Lighting Knowledge, Exposre ইত্যাদি। রঙ ও এর মধ্যে একটি। চিত্রশিল্পী, ডিজাইনার এর মত একজন ফটোগ্রাফারকেও রঙ নিয়ে জ্ঞান রাখতে হয় পাশাপাশি ছবিতে প্রয়োগ করতে হয়।
ফটোগ্রাফিতে রঙ খুবই গুরুত্বপূর্ণ জিনিস। কোন বিষয় নিয়ে বিস্তারিত জানতে গেলে সে বিষয়ে গোড়া থেকেই শুরু করা উচিত।
রঙ সাধারণত তিন ধরনের-
১. Primary Color
2. Secondary Color
Image Sorce: Pinterest
এখন আসি Primary Color বা প্রাথমিক রঙ বা মৌলিক রঙ বলতে কি বুঝায়। প্রাইমারি রঙ বা মৌলিক রঙ হচ্ছে যেগুলো আমরা সরাসরি প্রকৃতি থেকেই পাই এবং যে রঙ ছাড়া অন্য রঙ প্রস্তুত করা যায় না। যে রঙগুলো কোন রঙের মিশ্রন নয়। লাল, নীল, হলুদ এই ৩টি হচ্ছে প্রাথমিক রঙ বা মৌলিক রঙ। কিন্তু যদি আমরা ইলেক্ট্রনিক বা ডিজিটাল মাধ্যমে কাজ করি তাহলে মৌলিক রঙ হবে লাল (Red), সবুজ (Green), নীল (Blue) অর্থাৎ RGB। প্রিন্ট মিডিয়ার ক্ষেত্রে এটা হচ্ছে CMYK-Cyan, Magenta, Yellow, Black।
Secondary Color হলো যেকোন দু’টি প্রাথমিক রঙের মিশ্রনে যে নতুন রঙ তৈরী হয় তা। যেমন: লাল ও নীলের মিশ্রনে বেগুনি, নীল ও হলুদের মিশ্রনে সবুজ ইত্যাদি।
Tertiary Color বলতে দুইয়ের অধিক রঙের মিশ্রনে যে রঙ তৈরী হয় তাকে বুঝায়।
Leon Battista Alberti ছিলেন একজন মানবতাবাদী লেখক, শিল্পী, স্থপতি, কবি, যাজক, ভাষাবিদ, দার্শনিক, এবং ক্রিপ্টোগ্রাফার। ১৪৩৫ সালে তিনিই সর্বপ্রথম রঙ তত্ত্বটি লিপিবদ্ধ করেছিলেন। ১৪০০ দশকের শেষের দিকে লিওনার্দো দ্যা ভিঞ্চি তার পত্রিকায় রঙ তত্ত্বটি উল্লেখ করেছিলেন।
স্যার আইজ্যাক নিউটন সর্বপ্রথম কালার হুইল বা রঙ চক্র আবিষ্কার করেন এবং সেটিকে তিনি ১৭০৪ সালে সম্প্রসারিত করেন।
কালার হুইল-এ পাশাপাশি থাকা রঙ কে Analogous Color বলে, কালার হুইলে পরস্পর বিপরীত পাশে থাকা রঙকে Complementary Color বলে, পরস্পর তিনটি কালারকে Triadic Color বলে আর একটা কালার শেড কে Monochrome color বলে।
আমরা যখন কোন ঘর সাজাই অথবা কোন পোশাক পরি তখন রঙের সাথে রঙ মিলানোর চেষ্টা করি। যেমন: ঘর সাজানোর সময় আসবাবপত্রের সাথে মিল রেখে দেয়ালের রঙ কি হবে, কোন রঙের পর্দ হবে ইত্যাদি ঠিক করি। তেমন ছবি তোলার সময়ও এই বিষয়গুলো খেয়াল রাখতে হবে।
এখন আসি কিভাবে আমরা রঙ দেখি তা নিয়ে। সাধারণত আমরা চোখ মেললেই যা দেখি সবই রঙের খেলা। এই পৃথিবীতে রঙ ছাড়া কিছুই নেই। আমরা যা দেখি তা হলো দৃশ্যমান আলো। কোন রঙের আলো যখন আমাদের চোখে পড়ে তখন আমরা সে রঙের আলোকে দেখতে পাই। যেমন অন্ধকারে কোন আলো আমাদের চোখে পড়ে না বলেই আমরা কোন রঙ দেখি না। সেটাকে ব্রেইন কালো বলে ধরে নেয় অর্থাৎ কালো হচ্ছে রঙের অনুপস্থিতি। আসলে অন্ধকার হলো একটা ইল্যুশন বা ভ্রান্তি।
Image Sorce: www.steemit.com
আমাদের এই মহাবিশ্বের মোট আলোর খুব অল্প অংশ আমরা দেখতে পাই। বেশিরভাগ অংশই অদেখা থেকে যায়। মূলত আমাদের চোখ অনেক কিছুই দেখতে পায় কিন্তু আমাদের মস্তিষ্ক সব ধরে রাখতে পারে না শুধু নির্দিষ্ট তরঙ্গ দৈর্ঘে্যর বর্ণালী ধারণ করতে পারে।
আমরা চোখে যে রঙের আলো দেখি সব রঙের একটি নির্দিষ্ট তরঙ্গ দৈর্ঘ্য আছে।
Image Sorce: shutterstock.com
আলোর তরঙ্গ দৈর্ঘ্য 400nm-700nm (ন্যানোমিটার) এর মধ্যে হলে সেই আলো আমাদের চোখে দৃশ্যমান হয় অর্থাৎ 400nm-700nm তরঙ্গদৈর্ঘে্যর আলোকেই দৃশ্যমান আলো (Visible) বলে। 400nm এর নিচে ও 700nm এর উপরে তরঙ্গদৈর্ঘে্যর আলোকে আমরা দেখতে পাই না।
400nm -এর নীচের আলোগুলো হলো- UV Ray, X-Ray, Gamma Ray
700nm -এর উপরে তরঙ্গদৈর্ঘে্যর আলো হচ্ছে- Infrared, Radio Wave (Radar, TV, FM, AM)
400nm এর মধ্যে যে আলো রয়েছে তা হলো:
১. সূর্য (Sun)
2. Incandescent Light Bulb
- Fluorescent
- Helogen
- LED
- Laser
- HID (High Intensity Discharge)
Psycho Physicist মানুষের দর্শনানুভুতির উপর গবেষণা করে দেখেন যে মানুষ আলোর 1000 টি Shade দেখতে পায়। 100 টি গ্রেড Red-Green এর, 100 Yellow-Blue এর।
অর্থাৎ 1000x100x100=10,000,000 (10 Million)
একজন মানুষ ১০ মিলিয়ন রঙের শেড দেখতে পায়। এর মানে Single viewing Condition এ একজন মানুষ ১০ মিলিয়ন রঙ দেখতে পায়।
১০ মিলিয়ন রঙের অর্থ হলো-
10 million Color
10 Milllion Light Direction
10 Million lighting Level
এখন আমরা জানবো রঙের পরিবর্ত নশীল প্রকারভেদ নিয়ে। যারা সাধারণত Lightroom, Apple Photos, Capture One, Adobe Camera RAW ইত্যাদি বা অন্যকোন RAW Editor নিয়ে কাজ করেন তাঁরা HSL Slider নিয়ে জানেন।
Image Sorce: Pinterest
HSL হলো Hue, Saturation, Luminosity। এছাড়াও Photoshop, Lightroom, Capture One ইত্যাদিতে কাজ করার সময় আরোও কিছু বিষয় থাকে যেমন: Brightness, Contrast, Tint, Vibrance ইত্যাদি।
Image Sorce: Pinterest
Image Sorce: Pinterest
Liminosity: Luminosity বলতে রঙের উজ্জ্বলতাকে বুঝায়। Luminosity বাড়ালে বা কমালে রঙের উজ্জ্বলতা বাড়ে বা কমে।
I mage Sorce: brilliantreflective.com
www.semanticscholar.org
Contrast: Contrast বলতে রঙের তীব্রতাকে বুঝায়। কন্ট্রাস্ট যত বাড়ানো হয় রঙ ততো তীব্র হয়। সাদাকালো রঙের ক্ষেত্রে সেটা খুব চোখে পড়ে।
Tint: Tint বলতে একটা নির্দিষ্ট রঙের আভাকে বুঝায়। Tint পরিবর্তনের সাথে ছবিতে অন্য রঙের বাড়তি শেড যুক্ত হয়।
এখন আমরা আলোচনা করবো Color Space নিয়ে-
Color Space: প্রকৃতিতে অনেক রঙ। কম্পিউটার স্ক্রিনে তাকালেও আমরা রঙ দেখি। এই রঙ কম্পিউটার স্ক্রিনে কিংবা বইয়ের পাতায় কিভাবে আসলো সেটা জানা যাক। আপনি নিশ্চয়ই লেখাটি মোবাইলে কিংবা কম্পিউটারে পড়ছেন। আপনি কম্পিউটারে রঙিন ছবি দেখছেন, রঙিন ম্যাগাজিন পড়ছেন েএইসব কিছুই কম্পিউটার স্ক্রিন ঠিক করে দেয়।
সীমার উপর নির্ভর করে কয়েক ধরনের Color Space রয়েছে যেমন:
- sRGB
- Adobe RGB
- Photo Pro RGB
- Lab Color
সবচেয়ে বেশী সংখ্যক Color নিয়ে কাজ করে Photo Pro RGB, এর থেকে একটু কম স্পেস নিয়ে কাজ করে Adobe RGB এবং সবচেয়ে কম কালার স্পেস নিয়ে কাজ করে sRGB।
Image Source: uwphotographyguide.com
এবার আসি Color Bit Depth প্রসঙ্গে। Bit Depth হচ্ছে Color এর Technical পরিমাপ। অর্থাৎ প্রতি চ্যানেলে (RGB) কি পরিমাণ কালার থাকবে তার হিসাব। যখন আমরা ক্যামেরা দিয়ে 8bit এ শ্যুট করি তখন আমাদের ক্যামেরা 2^8 অর্থাৎ 256 Color রেকর্ড করে। এর অর্থ হচ্ছে 256 টি Red Shade, 256 টি Green Shade, 256 টি Blue Shade রেকর্ড করে।
অনুরূপভাবে যদি আমরা 12 bit নিয়ে কাজ করি তাহলে 2^12=4096 টি কালার রেকর্ড করে। অর্থাৎ 4096 টি Red Shade, 4096 টি Green Shade, 4096 টি Blue Shade রেকর্ড করে।
কালার বিট যত বেশ ী হবে আমরা ততো বেশী কালার নিয়ে কাজ করতে পারবো।
সুতরাং সবশেষে বলতে পারি একজন পেইন্টার, ডিজাইনার এর মত একজন ফটোগ্রাফারের রঙ সম্পর্কে ধারনা থাকা জরুরি। রঙের সঠিক ব্যবহারের অভাবে একটি শক্তিশালী ছবিও গুরুত্ব হারায়।
Souce: www.wix.com, রং-ধীমান দাস গুপ্ত, digitalphotographyschool.com



মন্তব্যসমূহ