নন্দনতত্ত্ব ও আলোকচিত্রের ব্যবচ্ছেদ
নন্দনতত্ত্ব বা সৌন্দর্য হচ্ছে দর্শনের অনেকগুলো শাখার মধ্যে একটি যা সৌন্দর্য্যের সৃষ্টি, স্বাদ (পছন্দ) ও প্রশংসা নিয়েই মূলতঃ আলোচনা করে। Britannica-র মতে নন্দনতত্ত্ব বা সৌন্দর্য্যতত্ত্ব হলো “সৌন্দর্য্য ও স্বাদের (পছন্দ) দার্শনিক অধ্যয়ন”। সৌন্দর্য্যতত্ত্ব একটি ব্যাপক বিষয়। এর বিষয়বস্তু নির্দিষ্ট করে দেওয়া কোনভাবেই সম্ভব নয়। সৌন্দর্য্যতত্ত্বের মধ্যে সৌন্দর্যানুভুতি, শিল্পকলার বিচার, সুন্দর-অসুন্দরের পার্থক্য প্রভৃতি সমস্যাকে সাধারণত অন্তর্ভূক্ত মনে করা হয়। যে কোন কিছুর নান্দনিক গুন থাকতে পারে তবে এটি পেইন্টিং, এনিমেশন, ড্রয়িং, আলোকচিত্র, চলচ্চিত্রের মত দৃশ্যশিল্পের সাথে বিশেষভাবে সম্পর্কিত।
নন্দনতত্ত্ব বিষয়ে জ্ঞানার্জনের অর্থ হলো সৌন্দর্য বিষয়ে জ্ঞানলাভ করা। প্রকৃতিতে আমরা যা দেখি বা আমাদের দৃষ্টি ক্ষমতার মধ্যে যা দেখি তার সবকিছুই কি সুন্দর? আমরা যাকে সুন্দর বলি সেটা কি আসলেই সুন্দর। আমরা যেটাকে শিল্প হিসেবে আখ্যায়িত করি তা কি আদৌ শিল্পের পর্য ায়ভুক্ত? নন্দনতত্ত্ব পাঠের অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে দেখার চোখ তৈরী করা, দেখার দৃষ্টিভঙ্গির সংস্কার সাধন করা। সুন্দরকে সুন্দর বলে আখ্যায়িত করতে শেখা। সৌন্দর্য্যে ব্যাখ্যা নিরূপন করা।
এত ছোট পরিসরে নন্দনতত্ত্বকে ব্যাখ্যা করা বা নন্দনতত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করা সম্ভব নয় তবুও আলোকচিত্রের ক্ষেত্রে নন্দনতত্ত্বের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি সল্প আলোচনায় বুঝানোর চেষ্টা করা যেতে পারে।
একজন আলেকচিত্রী হিসেবে নন্দনতত্ত্ব আমাদের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ কারণ আমরা চাই আমাদের ছবি দৃষ্টিনন্দন বা নান্দনিকভাবে সবার কাছে উপস্থাপিত হোক। দর্শক এটাকে সুন্দর হিসেবে দেখুক। আমরা এমন এক সময়ে এসে পৌছেছি যেখানে প্রতিদিন মিলিয়ন মিলিয়ন ছবি আপলোড হয় (শুধুমাত্র ইনস্টাগ্রামে প্রতিদিন প্রায় ৯৫ মিলিয়নের বেশি ছবি আপলোড হয়) সেখানে কোন ছবিকে রীতিমত যুদ্ধ করেই টিকে থাকতে হয়।
আলোকচিত্র হচ্ছে দৃশ্যশিল্পের একটা ধরন এবং নান্দনিকতা হচ্ছে এটার প্রধান পথ নির্দেশক। নান্দনিকতা ফটোগ্রাফির একটা উপাদান যা দৃশ্যমান সৌন্দর্য্যকে উপস্থাপন করে। নান্দনিকতা চিত্রের চরিত্রকে প্রভাবিত করে। এখানে নান্দনিক দিক এবং কিভাবে আমরা নন্দনতত্ত্বের সাহায্যে একটি সুন্দর ও দৃষ্টিনন্দন ছবি তৈরী করতে পারবো তা নিয়ে আলোচনার চেষ্টা করবো।
মূলত একটি ছবির নান্দনিকতা নির্ধারিত হয় দর্শক ছবিটি দেখার পর সৃষ্ট প্রতিক্রিয়া ও অনুভুতির উপর। ছবিতে টোন, রঙ, কম্পোজিশন, গল্প ইত্যাদির যথার্থ প্রয়োগের উপর আলোকচিত্রের নান্দনিকতা নির্ভর করে।
সাধারণত আমাদের কাছে দৃষ্টি আকর্ষনীয় ছবিগুলোই সুন্দর বলে মনে হয়। প্রকৃতপক্ষে সৌন্দর্য বা নান্দনিকতা হচ্ছে বৈষয়িক ও মনস্তাত্বিক ব্যাপার। একেকজনের কাছে সৌন্দর্য্যের সংজ্ঞা একেকরকম হয়।
নান্দনিকতার সাথে কম্পেজিশনের সম্পর্ক:
কম্পোজিশন শব্দটি কেবল ভিজুয়াল আর্টের জন্যই নয় এটি নৃত্য, সাহিত্য এবং অন্যকোন শিল্পের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। আলোকচিত্রের ক্ষেত্রে আমরা বলতে পারি একটি আলোকচিত্র তৈরী করতে ছবির সাবজেক্ট ও অন্য উপাদানগুলো কিভাবে ফ্রেমে সাজাতে হবে সেই পদ্ধতি বা কৌশল হলো কম্পোজিশন। আমি ছবিতে কি কি রাখবো কি কি বাদ দিবো সবই কম্পোজিশনের পর্য ায়ভুক্ত। কম্পোজিশনের যেকোন কৌশল অনুসরণ করে আমরা ছবিকে নান্দনিক রূপ দিতে পারি।
অন্যভাবে বলা যায়, ছবির নান্দনিকতা নির্ভর করে আমরা ছবিকে কিভাবে কম্পোজড করেছি তার উপর। কম্পোজিশনে আলো, বিষয়বস্তুর (Subject) অবস্থান, লিডিং লাইন ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ। ছবিতে অত্যাবশ্যকীয় উপাদানসমূহের সঠিক ও যথার্থ ব্যবহার আলোকচিত্রকে নান্দনিক করে তুলতে পারে। ফটোগ্রাফিতে যে বিষয়গুলো নান্দনিকতাকে খুব বেশী প্রভাবিত করে তা নিয়ে নিম্নে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করার চেষ্টা করেছি-
রং: আমাদের ছবিতে বিভিন্ন ধরনের রংয়ের ব্যবহার ছবির নান্দনিকতাকে প্রভাবিত করে। আমরা ইচ্ছে করলে Light, Dark, Saturated অথবা Muted Tones ব্যবহার করতে পারি অথবা ইচ্ছে করলে সাদাকালোতেও ছবি তুলতে পারি। সবকিছুই নির্ভর করছে ফটোগ্রাফারের একান্ত ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ, চিন্তা-চেতনার উপর। ভিন্ন ভিন্ন রংয়ের প্রয়োগ ভিন্ন ভিন্ন আবেগ ও অনুভুতির সৃষ্টি করে। উদাহরণসরূপ বলতে পারি লাল রং-কে ভয়, লজ্জ্বা, জলন্ত, শক্তিশালী রং হিসেবে দেখা হয়। অপরদিকে নীল রংকে শীতল, নির্মল হিসেবে দেখা হয়। রং সম্পর্কিত আবেগ, অনুভুতিগুলো নির্ভর করে দর্শকের পছন্দ, অপছন্দ, বিশ্বাস, অভিজ্ঞতা ইত্যাদির উপর। বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে রংয়ের অর্থ বিভিন্ন হতে পারে।
রং দর্শকের মনে কিভাবে প্রভাব ফেলে: এই বিষয়টি ব্যাখ্যা করার জন্য আমরা লাল রংকে উদাহরণ হিসেবে ধরতে পারি। যদি কেউ সবে প্রেমে পড়ে, সে প্রেম ও আবেগের রং হিসেবে লালকে চিহ্নিত করবে। অপরদিকে যদি কেউ কিছুক্ষণ আগে হরর মুভি দেখে থাকে তবে সে লালকে ভয় এবং বিপদের রং হিসেবে ধরে নেবে।
সংস্কৃতিও রংয়ের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে যেমন আমি কি ধরনের সংস্কৃতি ধারন করছি, কি ধরনের সংস্কৃতির মধ্যে বসবাস করছি তার উপর ভিত্তি করে রংয়ের ব্যাখ্যা ভিন্ন হতে পারে উদাহরণসরূপ বলা যায় কিছু সংস্কৃতিতে লাল রংকে বিপদের চিহ্ন হিসেবে ধরা হয়। অপরদিকে কিছু সংস্কৃতিতে এটি সুখ ও শান্তির প্রতীক। এত এত বিশ্বাস, মতভেদ সত্বেও আলোকচিত্রের নান্দনিকতাকে প্রভাবিত করার ক্ষেত্রে রং গুরুত্বের দাবি রাখে। প্রকৃতি থেকে আমরা যে রং পাই তারও বিভিন্ন ব্যাখ্যা রয়েছে যেমন- নীল হলো জলের রং, লাল হলো আগুনের রং, সবুজ হলো ঘাসের রং, হলুদ হলো সূর্যের রং ইত্যাদি। আমি ছবিতে যে রং ব্যবহার করেছি তা কিভাবে ব্যবহার করেছি তার উপর নির্ভর করে ছবির ভাব, মেসেজ এবং নান্দনিকতা পরিবর্তন হতে পারে।
কন্ট্রাস্ট (Contrast):
Photo: Samiran Chakraborty
ফটোগ্রাফির যে নান্দনিক আবেদন, যে নান্দনিক সৌন্দর্য্য আলো-আঁধারের যথার্থ ব্যবহারিক কৌশল প্রয়োগ অতীব গুরুত্বপূর্ণ । আলো-আঁধারের যথার্থ প্রয়োগে যে রহস্যময়তা সৃষ্টি হয় তা আলোকচিত্রের অন্তর্নিহীত ভাবকে আরোও জাগ্রত করে। সহজ ভাষায় কন্ট্রাস্ট বলতে বৈপরিত্য বোঝায়। ব্যাপক অর্থে কন্ট্রাস্ট বলতে আলো-আঁধারের টোনের পার্থক্য, রঙের ক্ষেত্রে হালকা ও গাঢ় রঙের পার্থক্য, সাদা ও কালোর পার্থক্যকে বোঝানো হয়। আমরা জানি দর্শক যখন ছবির দিকে তাকায় তখন তার মনোযোগ প্রথমে যায় সেন্টার অব ইন্টারেস্ট-র দিকে। যদি ছবির উপাদানগুলির মধ্যে অবস্থানগত পার্থক্য এমন হয় যে কন্ট্রাস্ট তৈরী হয় তাহলে তা দর্শকের মনযোগ অনেকগুন বাড়িয়ে দেয়- এটাই হলো ছবিতে কন্ট্রাস্ট-র কার্যকরী ব্যবহার।
আলো: আলো হচ্ছে ছবির নান্দনিকতা ও ভাবকে প্রভাবিত করার আরেকটি অধিক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। ছবির বিষয়বস্তু বা সাবজেক্ট-র অদ্ভুত পরিবর্তন হতে পারে। যদি ছবিতে আলোর ডিরেকশন পরিবর্তন করি তাহলে পুরো ছবির বিষয়বস্তুতে পরিবর্তন আনে। হাইলাইট, শ্যাডো, গঠন, আকৃতি সবকিছুই পরিবর্তিত হয় ্আলোর ডিরেকশন পরিবর্তনের সাথে সাথে। সাধারণত তিনটি উপায়ে ছবির বিষয়বস্তু বা সাবজেক্টকে আলোকিত করা যায়-
১. Front Lighting
২.Side Lighting
৩.Back Lighting
এক্সপোজার: চিত্রের নান্দনিকতার পরিবর্তনের জন্য একজন আলোকচিত্রীর কাছে এক্সপোজার হলো সৃজনশীল সরঞ্জাম। অবস্থানভেদে এক্সপোজার বিভিন্ন হতে পারে। উদ্দেশ্যমূলকভাবে কোন ছবিকে আন্ডার এক্সপোজড ও ওভার এক্সপোজড করা যেতে পারে এবং সেটা অবশ্যই প্রয়োজনীয়তা ও নান্দনিক দিক বিচার করে। কেমন এক্সপোজার রাখা হবে ছবিতে সেটা নির্ভর করে আলোকচিত্রীর একান্ত ব্যক্তিগত পছন্দের উপর। অনেক সময় ওভার এক্সপোজড ছবিও সুরিয়াল বা পরাবাস্তব ভাব এনে দেয়।
ফোকাস: ফোকাস একটি পরিপূর্ণ ও সফল ছবির মূল ্উপাদান। এটি নান্দনিকতার সাথেও আন্তঃসম্পর্কিত। ফ্রেমের মধ্যে কোন উপাদানগুলিকে ফোকাসে রাখা হবে এবং কোন অংশগুলিকে ফোকাসের বাইরে রাখা হবে সেটা ছবির চরিত্রের উপর নির্ভর করে। ছবিতে যে অংশ ফোকাসে রাখা হবে সেই অংশ দর্শকের চোখে আগে পড়বে এবং অন্য অংশগুলি ব্যাকগ্রাউন্ডে চলে যাবে। তাই একজন আলোকচিত্রী কোথায় তার ফোকাস রাখবেন সেটা তার নিজস্ব চিন্তা-ভাবনা, গল্প, উদ্দেশ্য ইত্যাদির উপর নির্ভর করে এবং এটা ছবির নান্দনিকতাকেও প্রভাবিত করে।
টেক্সার :
Photo: Samiran Chakraborty
দর্শকের মনকে আন্দোলিত করার জন্য, স্পর্শের অনুভূতি দেয়ার জন্য ছবিতে টেক্সার রাখা যেতে পারে। কোন ছবিতে টেক্সার ব্যবহারের মাধ্যমে দর্শক কোন সাবজেক্টকে স্পর্শ করার অনুভূতি পেতে পারে যেমন- এটি কি মসৃন, লোমশ, রুক্ষ বা তীক্ষ্ণ ইত্যদি। টেক্সার আলোকচিত্রের গভীরতার জন্য অনূঘটক হিসেবে কাজ করে। একজন আলোকচিত্রী চাইলেই ছবিতে টেক্সার যুক্ত করতে পারে। টেক্সার যুক্ত করার সহজ উপায় হলো এমন সাবজেক্ট নির্বাচন করা যাতে প্রচুর ডিটেইলস আছে। মনে রাখতে হবে আলোকচিত্রের টেক্সার বা জমিন আলোর মানের উপর নির্ভর করে। কোন ছবিতে সাবজেক্ট-র টেক্সারটি হইলাইট করতে পর্যাপ্ত আলো প্রয়োজন। সল্প আলোতে টেক্সার প্রায় অসম্ভব। আলোর এঙ্গেল বা কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পাশ থেকে বা উপর থেকে আসা আলো ডিটেইলস ও স্পষ্ট টেক্সার আনতে পারে। তীব্র সূর্যের আলো এক্ষেত্রে খুব কার্যকরী।
Symmetry ও Balance: ছবির সাবজেক্টকে ফ্রেমের সেন্টারে বসালে সিমেট্রি সৃষ্টি হয়। এতে ছবির প্রাণবন্ততা নষ্ট হয়। সিমেট্রি দর্শকের চোখকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে না কারণ এতে সাবজেক্ট কেন্দ্রে থাকে।
অপরদিকে সাবজেক্ট অফ সেন্টারে স্থাপন করলে সেটা ছবিকে অনেক গতিশীল করে তখন সেটাকে asymmetry বলা হয়। asymetry ছবিতে গতি সঞ্চার করে। asymetry-র মূল্য ছবির নান্দনিকতায় এটা স্পষ্ট হয় কম্পোজিশনের রুলস যেমন- Rules of Third, Golden Ratio ইত্যাদির মধ্যে। তার মানে এই নয় যে symmetry এভয়েড করতে হবে। অনেক সময় এমন হয় সাবজেক্টকে সেন্টারে রাখলেই ভালো লাগে। কিন্তু asymmetrical Layout ছবিকে প্রাণবন্ত করে।
** আলোকচিত্র কতটুকু নান্দনিক তা সম্পূর্ণ
ভাবে আলোকচিত্রীর যথাযথ কৌশল প্রয়োগ ও তার নিজস্ব শৈল্পিক দৃষ্টি, দেখার ভঙ্গি, চিন্তা ও মননের উপর নির্ভর করছে।
তথ্যসূত্র:
1. How to Use Rules of Third in Photography.
2. RAW vs JPEG: The Full Story.
3. How to Use Your Camera: Understanding Exposure.
4. 20 Ways to tell a story with a Single Image




মন্তব্যসমূহ