সাদাকালো ছবি ও তৎ সম্পর্কিত বিষয়াবলী
ক্যামেরা আবিষ্কার হওয়ার আগে মানুষ ছবির জন্য প্রচলিত মিডিয়ামের উপর নির্ভরশীল ছিল উদাহরণসরূপ- চিত্রকর্ম , স্কেচ ইত্যদির উপর। প্রথম ক্যামেরা আবিষ্কার হয় ১৮২০ এর দশকে। যখন ক্যামেরায় প্রথম ছবি তোলা হয়েছিল তখন সবাই খুব অবাক হলো কারণ ক্যামেরার ছবিতে অন্য মিডিয়ামগুলোর তুলনায় আরো বেশী ডিটেইলস্ পাওয়া গেল। এরপর মানুষ আস্তে আস্তে ক্যামেরার ছবির উপর আকৃষ্ট হতে শুরু করলো। ক্যামেরা আবিষ্কার হওয়ার পরে প্রথমে ছবি তোলা হতো সাদাকালো। আজকের আলোচনা যেহেতু সাদাকালো ছবি নিয়ে সেহেতু ক্যামেরা আবিষ্কারের প্রথম দিকের কথা না বললেই নয়। ছবির তোলারন ইতিহাস যদি বলতে যাই প্রথমেই বলতে হয় জোসেফ নিসফোর এর কথা। প্রথম সাদাকালো ছবি ধারন করেছিলেন জোসেফ নিসফোর নিপস। তবে এর কপি তৈরী করার সময় সে ছবিটি ধ্বংস হয়ে যায়। পরবর্তীতে ১৮২৫ সালে তিনি আবার চেষ্টা করেন এবং একটি জানালার সাদাকালো ছবি ধারন করতে সক্ষম হন। তাঁর আবিষ্কারটি পরে অন্যদের দ্বারা আরো উন্নত করা হয়েছিল। এটি তৈরী হয়েছিল অপটিক্যাল লাইট ওয়েভ ইন্টারফেসের উপর ভিত্তি করে। এটি ১৯০৮ সালে তাকে পদার্থ বিজ্ঞানে নোবেল এনে দিয়েছিল। প্রথমদিকের ফিল্ম ক্যামেরা মূলত সাদাকালো ছবি ধারন করতে সক্ষম ছিল। পরবর্তীতে রঙ্গীণ ছবি তোলার পদ্ধতি আবিষ্কারের পরেও সাদাকালো ছবি তার আধিপত্য বিস্তার করেছিল কারণ এর ক্লসিক লুক, কম খরচ, অধিক স্থায়িত্ব। আধুনিক বিশ্বেও সাদাকালো ছবি মানুষের পছন্দের।
আমরা ছোটবেলা থেকেই পৃথিবীকে রঙিন দেখতে অভ্যস্থ। যেহেতু আমরা পৃথিবীকে রঙিন দেখি সেহেতু আমরা বলতে পারি রঙিন ছবি সরাসরি বাস্তবতাকে উপস্থাপন করে। যদি সাদাকালো আলোকচিত্র হয় এর অর্থ হচ্ছে আপনি নিজে কিভাবে বাস্তবতাকে দেখেন, কিভাবে অনুধাবন করেন এবং কিভাবে দর্শকের সামনে উপস্থাপন করবেন তার বহিঃপ্রকাশ। যখন কোন রঙিন ছবিকে সাদাকালোতে রূপান্তর করা হয় তখন শুধু ছবির রঙগুলোকেই অপসারণ করা হয় না; একটি রঙ আরেকটি রঙের সাথে কিভাবে সম্পর্কিত তা খুঁজতে উৎসাহিত করে এবং গল্প বলার ক্ষেত্রেও নতুন ভাষা তৈরীতে সাহায্য করে। এই ভাষা দিয়ে আপনি দর্শকের মনোজগতকে আন্দোলিত করতে পারবেন এবং নতুন ভাবনা ও অনুভুতির সৃষ্টি করতে পারবেন।
আপনি যখন কোন রঙিন ছবি থেকে রঙগুলোকে অপসারণ করেন তখন দর্শক যা দেখতে অভ্যস্থ সেটাও তার মস্তিষ্ক থেকে মুছে ফেলেন এবং সে নতুনভাবে ভাবতে শুরু করে। এর ফলে যা হয় তা হলো দর্শক ছবিতে রঙের পরিবর্তে ছবির মধ্যে অন্যকোন শক্তিশালী উপাদানকে খুঁজতে থাকে যেমন- লাইন, শেপ, ফর্ম, জ্যামিতিক আকার ইত্যাদি। ছবিতে ভিন্ন টোনাল রেঞ্জ, রিচ ব্ল্যাক এবং ডীপ কন্ট্রাস্ট অন্যরকম আবেদন তৈরী করে এবং ছবি দেখার সময় দর্শককে থামিয়ে দিয়ে কিছু সময় ভাবতে বাধ্য করে এবং ছবিতে যা দেখানো হয়েছে মনোযোগ সেদিকে নিয়ে যায়।
অনেক আলোকচিত্রী ডকুমেন্টারি, স্টোরি টেলিং, স্ট্রিট ফটোগ্রাফিতে সাদাকালো ব্যবহার করতে পছন্দ করেন। এর কারণ হল কানেকশন, ইমোশন, কন্টেন্ট, শেপ, লাইন, ফর্ম অনেকবেশী শক্তিশালী হয়। যে ছবিতে লাইন, শেপ, টেক্সার অনেক বেশী ুস্ট্রং সে ছবিকে আমরা চাইলে অনায়াসে সাদাকালোতে নিতে পারি। অনেকসময় ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, গত হয়ে যাওয়া সময় বা হারিয়ে যাওয়া সময় বুঝাতেও সাদাকালো ব্যবহার করা হয়। সাদাকালো ছবির বিষয়টা অনেক সময় আলোকচিত্রীর নিজস্ব পছন্দ, অপছন্দ, যাপিত জীবন, নান্দনিক দিক ইত্যাদি বিবেচনা করে হয়ে থাকে।
আমরা চোখ মূলত ছবিতে কিছু বিষয়ের প্রতি প্রবলভাবে আকৃষ্ট হয় যেমন:
- Strong Line, Texture, Shape, Geometric Form
- Face on figure
- Sharp area
- Bright area
- High contrast area
Photo : Samiran Chakraborty
Photo : Samiran Chakraborty
ছবি সাদাকালো করার একটা অন্যতম কারণ হলো ছবিতে রঙের আধিপত্যকে বাদ দেয়া। এর ফলে দর্শকের চোখ চলে যায় শেপ, লাইন, ফর্ম, টেক্সার-এ। হয়তোবা কালারেও এটি একটি দুর্দান্ত ছবি হতো। এক্ষেত্রে রঙের গুরুত্ব, রঙের ভাষা বুঝে রঙ অপসারণ করতে হবে যেমন:
লাল- উষ্ঞতা, আবেগ, শক্তি, যুদ্ধ, বিপদ
নীল- শান্ত, শুদ্ধতা, বিশ্বাস, বিষন্নতা, প্রেম
হলুদ-সুখ, আনন্দ, কল্পনা
সবুজ-প্রকৃতি, উদারতা, যৌবন
কমলা- উৎসাহ, উষ্ঞতা, শক্তি
সাদা- বিশুদ্ধতা, পবিত্রতা
কালো- শোক, আবেগ, ভয়, অসুখ
এর মধ্যে কিছু রঙ শীতল আর কিছু রঙ উষ্ঞ। শীতল রঙ আমাদের শীতল অনুভুতি দেয় যেমন: নীল, বেগুনি, শীতল রঙ আর লাল, কমলা, হলুদ এইগুলো হলো উষ্ঞ রঙ। কিন্তু বিখ্যাত শিল্পী ভ্যান গগ আমাদের এই ধারনাকে সম্পূর্ণ ভেঙ্গে দিয়েছেন। তিনি হলুদ রঙকে তার পেইন্টিংয়ে বেদনার রঙ হিসেবে দেখিয়েছেন।
হয়তোবা বরফের রঙ নীলাভ তাই নীলকে শীতল রঙ এবং আগুনের রঙ লাল তাই লাল রঙকে উষ্ঞ রঙ হিসেবে আমাদের অবচেতন মন ধরে নেয়।
উপরের বিষয়গুলো ছাড়াও যদি ছবিতে আলোর তারতম্য থাকে এবং সেটি ছবির মূল বিষয়বস্তুর আকর্ষন নষ্ট করে দেয় সেক্ষেত্রে সাদাকালো করা ভালো। রঙিন ছবিতে অনেক সময় লাইটের ডিরেকশন বুঝা যায় না সেক্ষেত্রে সাদাকালো করা ভালো কারণ সাদাকালো ছবিতে লাইটের ডিরেকশন ভালো বুঝা যায় এবং ছবিতে নাটকীয় অনুভুতির সৃষ্টি হয়।
সাদাকালো ছবি দর্শকের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করে দিতে পারে এবং ছবিতে রহস্য সৃষ্টি করে। যেহেতু রহস্য সবসময় লুকায়িত থাকে তাই দর্শককে ছবি দেখে ভাবার জন্য অনুপ্রাণিত করে। সুরিয়াল বা পরাবাস্তব ছবির সাথে সাদাকালো ছবির এক অনন্য সম্পর্ক আছে। সুরিয়াল ছবিতে এর প্রয়োগ অন্য মাত্রা যোগ করে।
আপনি যখন সাদাকালোতে ছবি তুলছেন বা রঙিন ছবিকে সাদাকালোতে কনভার্ট করছেন তখন আপনি রঙের বিকৃতি (destortion) অপসারণ করার জন্য নিজেকেই চ্যালেঞ্জ করছেন। কারণ ছবিতে হয়তো Color cast, Co;or temperature, Color difference থাকতে পারে যা আপনার ছবির মূল গল্প থেকে আপনাকে দুরে নিয়ে যাবে।
আলো ফটোগ্রাফির গুরুত্বপূর্ণ বিষয় কারণ আলো শেপ (Shape) তৈরী করে, আলো লাইন তৈরী করে, টেক্সার তৈরী করে এবং রঙ নির্ধারণ করতে সাহায্য করে। একজন চিত্রশিল্পীর জন্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হচ্ছে রঙ, ভাষ্করের জন্য কাদা তেমনি ফটোগ্রাফির জন্যে আলো।
পৃথিবীতে অনেক ফটোগ্রাফার সাদাকালোতে দারুন, নান্দনিক ছবি তুলেছেন। তারা প্রচলিত নিয়মের বাইরে গিয়ে ওয়েডিং, ওয়াইল্ড লাইফ, ফ্যাশন ফটোগ্রাফিতেও সাদাকালোয় দুর্দান্ত ছবি তুলেছেন।
Carlo Carlatti- Wedding
Photo: Andy Spyra
Photo: Andy Spyra
Photo: Pendro Luis Raota
Photo: Pendro Luis Raota
Photo: Piergiorgio Branzi












মন্তব্যসমূহ
ধন্যবাদ