পৃথিবীর যত দৃষ্টিহীন আলোকচিত্রী
আমরা যারা ফটোগ্রাফি করি তারা জানি ফটোগ্রাফিতে দেখাটা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের পথপ্রদর্শকরা সবসময় বলে থাকেন দেখা শেখার কথা কারণ যে যত ভালো দেখে সে তত ভালো ছবি তুলতে পারে। কিন্তু যদি বিষয়টা এমন হয় যে দেখা ছাড়া শুধুমাত্র অনুভুতির মাধ্যমে পুরো পরিবেশটাকে বুঝে ছবি তোলা যায়। অবাক হওয়ার কিছু নেই এটাই সম্ভব করেছেন পৃথিবীতে কিছু মানুষ। যারা আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে অন্ধ হয়েও ফটোগ্রাফি করেছেন। জুলিয়ান রথেনস্টাইন নামে একজন পাবলিশার্স ২০১৬ সালে বিশ্বজুড়ে আংশিক এবং পুরোপুরি অন্ধ ফটোগ্রাফারদের ১৫০টি ছবি নিয়ে নিয়ে একটি বই বের করেন নাম “The Blind Photographer”। ছবিগুলো দেখলে অবাক লাগে প্রায়ই সাবজেক্টকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় যা আমরা অনেকেই ভাবতেই পারি না। এর মাধ্যমে বুঝা যায় যে, দৃষ্টিহীন ব্যক্তিরা আসলে একরঙ্গা অন্ধকারে বাস করেন না তারাও বস্তুর উপস্থিতি, নাড়াচড়া, ঘ্রাণ, স্পর্শ, পরিবেশের গন্ধ দিয়ে পুরো পরিবেশটাকে কল্পনা করতে পারেন।
ছবিগুলো শুধুমাত্র দর্শককে দেখার জন্য নয়, একটি মুহুর্ত কল্পনা করতে সাহায্য করে যেমন- এর গতি, তাপমাত্র ও শব্দ ইত্যদি। আমি ১৯ জন ফটোগ্রাফার এর সন্ধান পেয়েছি যারা আংশিক অথবা সম্পূর্ণরূপে দৃষ্টিহীন হওয়ার পরেও নিজের চেষ্টায়, আগ্রহের ফলে ফটোগ্রাফি করছেন প্রফেশনালি বা শখের বশে। “The Blind Photographer”। বইটি বিশ্বের ১২জন অন্ধ ফটোগ্রাফার এর ছবি নিয়ে সাজানো হয়েছে তারা হলেন- Ian Treherne, Ana
Maria Fernandez, Alberto Loranca, Gaoshan, Ever Green, Ruben Ortiz, Marco
Antonio, Gary Waite, Pedro Miranda, Matt Larsen, Christian Lombardi, Satvir Jogi
| এছাড়াও
আছেন Pete Eckert, James M.
Gates, Bruce Hall, Evgen Bavcar, Rosita McKenzie, Ian Treherne, Pranav Lal Ges Jin Ling
অনেকের কাছে দৃষ্টি প্রতিবন্ধি হয়েও ফটোগ্রাফি শুরু করা অকল্পনীয় না হলেও উচ্চাভিলাষী মনে হতে পারে। তবুও অনেক প্রচেষ্টা, আগ্রহ, ধৈর্য্যরে কারণে ক্যামেরা দিয়ে তুলেছেন দারুন ছবি।
Evgen Bavcar বলেছিলেন- আমি যে সমস্ত ছবি তুলি তা আমার মনের মধ্যে আগে থেকেই ছিল এবং আমার তৃতীয় চোখ, আত্মার দ্বারা উপলব্ধি করা।
এখানে যে ক’জন ফটোগ্রাফারের নাম উল্লেখ করা হয়েছে তারা শুধু সুন্দর ফটোগ্রাফি করার জন্য ফটোগ্রাফি করেন তা নয় তারা চেয়েছেন পৃথিবীর মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে। Ian Treherne বলেছেন তিনি অনেক পরিশ্রম করে তার ক্যামেরা সেট আপ করেন এবং যখন শাটার ক্লিক করেন তখনই তিনি অনুভব করেন যে, তিনি যেটা চেয়েছিলেন সে শটটাই তিনি পেয়েছেন। সম্পূর্ণ অন্ধ হওয়া সত্তে¦ও তিনি বলেন যে তিনি এমন জিনিস দেখেন যা অন্য লোকেরা দেখে না। তিনি জন্মগতভাবেই ছিলেন বধির এবং শ্রবণযন্ত্রের সাহায্যে শব্দ শুনতেন কিন্তু কিশোর বয়সে তিনি তার দৃষ্টিশক্তি হারাতে থাকেন। যখন তার বয়স ১৫ বছর, Treherne বুঝতে পেরেছিলেন যে তিনি তার বন্ধুদের মত চোখে ভালো দেখেন না। এরপর তিনি একজন চক্ষু বিশেষজ্ঞ দেখান এবং বিশেষজ্ঞ তাকে হাসপাতালে পাঠান। হাসপাতালের একজন ডাক্তার তাকে বলেছিলেন তিনি উশার সিনড্রোম নামক এক বিরল জেনেটিক অবস্থার কারণে ধীরে ধীরে অন্ধ হয়ে যাচ্ছেন। Treherne বলেন এটা শুনার পর থেকেই আমি এটা মোকাবেলা করার জন্য চেষ্টা করে গেছি এবং আমার স্বপ্ন পুরণের জন্য নিজের উপর চাপ প্রয়োগ করতে থাকি। পরবর্তীতে তিনি তার ৯৫% দৃষ্টিশক্তি হারিয়ে ফেলেন। এটা তিনি বেশীরভাগ সময় লুকিয়ে রাখতেন। তিনি একজন অন্ধ এটা তিনি মেনে নেওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। তার অনেক বন্ধু ছিল কিন্তু বয়স বাড়ার সাথে সাথে তিন সবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। Treherne বলেন যিনি ছবি আঁকেন, চলচিত্র তৈরী করেন এবং বাদ্যযন্ত্র বাজান।
অপরদিকে প্রণব লাল ভুজিক্স ব্লেড স্মার্ট চশমা পরেন যার মধ্যে ক্যামেরা সংযুক্ত। যা ছবি রেকর্ড করে ভয়েস শব্দে রূপান্তরিত করে। কিন্তু সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং কাজ হচ্ছে সেই ছবির শব্দের ব্যাখ্যা করা শেখা। প্রণব লালের বয়স ৩২ বছর। তিনি ছিলেন জন্ম থেকেই অন্ধ। প্রযুক্তি ব্যবহার করে সৃজনশীলতার কথা উল্লেখ না করে তিনি দৃষ্টি প্রতিবন্ধিদের নিয়ে যে সব ভ্রান্ত ধারনা সমাজে প্রচলিত তা সম্পূর্ণই ভেঙ্গে দিয়েছেন। ২০০১ সালে তিনি “ভয়েস”
নামে একটি সফটওয়্যার এর সন্ধান পান, যা অন্ধদের দেখার চাক্ষুষ অভিজ্ঞতা দিয়ে থাকে। সফটওয়্যারটি ছবিকে শব্দে রূপান্তরিত করে যা তিনি হেডফোনের মাধ্যমে শোনে এবং তিনি কি দেখছেন তা নির্ধারণ করেন। শব্দের উচ্চতা প্রণব লালকে দৃশ্যের উজ্জ্বলতা সম্পর্কে ধারনা দেয়। উচ্চ শব্দ অধিক উজ্জ্বল দৃশ্য বোঝায়। কোন বস্তু যদি বাম থেকে ডানে অবস্থান পরিবর্তন করে হেডফোনে তার অবস্থান বলে দেয় এবং উচ্চতাও। এই সফটওয়্যারটি একটি কৃত্তিম চোখ হিসেবে কাজ করে। যেখানে তিনি কোন কিছু স্পর্শ না করেই অনুভব করতে পারেন। প্রণব বলেন অনেক বাধাই আসতে পারে কিন্তু ভ্রমনের সময় কখনো তিনি ক্যামেরা সাথে নিতে ভুলবেন না। তার এই অন্ধত্ব কখনই তাকে কোন কাজ থেকে বিরত রাখতে পারেনি। তিনি বিজনেস ম্যানেজমেন্ট বিষয়ে মাস্টার্স ডিগ্রী অর্জন করেনছেন পাশাপাশি নয়াদিল্লিতে একটি কর্পোরেট ফার্মে কাজ করেন সুযোগ পেলেই ছবি তুলতে বের হন।
নীচে অন্ধ ফটোগ্রাফারদের তোলা কিছু ছবি দেওয়া হলো:
Satvir Jogi
ছবি ও তথ্যসূত্র:
peteeckert.com, jgatesphotography.com, visualsummit.com, evgenbavcar.com, rositamckenzie.co.uk, bbc.com, huffpost.com





















মন্তব্যসমূহ